Home » Bengali News » রাজ্যগুলির মতামত ছাড়াই নতুন আইন কেন?

রাজ্যগুলির মতামত ছাড়াই নতুন আইন কেন?

হাইলাইটস

  • ভারত সরকারের নারী ও শিশুবিকাশ মন্ত্রক ২০২১ সালের মানবপাচার (প্রতিরোধ, দেখাশোনা ও পুনর্বাসন) বিলের খসড়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের কাছ থেকে মন্তব্য এবং প্রস্তাব আহ্বান করেছে।
  • মানব পাচার, বিশেষত নারী ও শিশু পাচার প্রতিহত করা, কেউ পাচারের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দেখাশোনা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এই বিলের মূল উদ্দেশ্য।
  • চূড়ান্ত খসড়াটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

সত্যগোপাল দে

সম্প্রতি ভারত সরকারের নারী ও শিশুবিকাশ মন্ত্রক ২০২১ সালের মানবপাচার (প্রতিরোধ, দেখাশোনা ও পুনর্বাসন) বিলের খসড়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের কাছ থেকে মন্তব্য এবং প্রস্তাব আহ্বান করেছে। মানব পাচার, বিশেষত নারী ও শিশু পাচার প্রতিহত করা, কেউ পাচারের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দেখাশোনা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এই বিলের মূল উদ্দেশ্য। এ ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের মানবাধিকার রক্ষা, তাঁদের জন্য আইনি ও অর্থনৈতিক সহায়তা, ক্ষতিপূরণ ও সমাজে সম্মান বজায় রাখা, মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা ইত্যাদি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ও বিচারবিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দিকটিও এই বিলে থাকবে। চূড়ান্ত খসড়াটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

অনুমোদনের পর সেটি সংসদের উভয় কক্ষে পাস করিয়ে আইনে পরিণত করা হবে। সীমান্তে মানুষ পাচারের মতো বিষয় অর্থাৎ ক্রস-বর্ডার ট্র্যাফিকিংয়ের ঘটনা এই আইনে অন্তর্ভুক্ত হবে। আপাতদৃষ্টিতে সরকারের এই প্রচেষ্টাকে ভালোই বলতে হবে কিন্তু এমন একটি দীর্ঘ-প্রতীক্ষিত আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা দরকার। কিন্তু তার আগে একটু ইতিহাসের পাতা ওল্টানো যাক।

স্বাধীনতার ঠিক তিন বছর পর ১৯৫০-এর ২১ মার্চ, নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সদর দফতরে অনুষ্ঠিত হয় ‘কনভেনশন ফর দ্য ট্র্যাফিক ইন পার্সন অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেশন অফ প্রস্টিটিউশন অফ আদারস’। এই আন্তর্জাতিক আইনটিকে র‍্যাটিফাই অর্থাৎ মান্যতা দেওয়ার ফলে অংশগ্রহণকারী দেশগুলি মানবপাচার প্রতিরোধে দায়বদ্ধ থাকল। ফলস্বরূপ ভারতীয় সংসদের উভয় কক্ষে পাস হয়ে গেল ‘ইমরাল ট্র্যাফিক (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট ১৯৫৬’, কিন্তু জন্মলগ্ন থেকেই আইনটি ছিল একপেশে শুধুমাত্র যৌনকার্যের জন্য পাচার হওয়া মেয়েদের এই আইনের আওতায় আনা হল। কোনও ব্যক্তি যদি ব্রথেল অর্থাৎ গণিকালয় পরিচালনা করে তা হলে সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

আঠারো বছরের ঊর্ধ্বে কোনও ব্যক্তি যদি যৌনকর্মীর উপার্জিত অর্থে জীবনধারণ করে, তা হলে তাকেও শাস্তি দেওয়া হবে। মানব পাচার, বিশেষ করে নারী ও শিশু পাচারের বহুমুখী কারণ, বহুমুখী পদ্ধতি এবং বহুমাত্রিক উদ্দেশ্য আছে কিন্তু এই একপেশে আইন এবং এটির পরবর্তীকালে কয়েকটি একপেশে অ্যামেন্ডমেন্ট মানবপাচারের বিরুদ্ধে প্রধান হাতিয়ার হয়ে রইল দীর্ঘকাল।

প্রস্তাবিত বিলটি প্রাথমিক বিশ্লেষণে বহুমুখী বলেই মনে হচ্ছে, শুধুমাত্র যৌনকার্য জনিত পাচার নয়, চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন, ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে পাচার হওয়া নারী, পুরুষ, শিশু, ট্র্যান্সজেন্ডার সকলকে এর আওতায় আনা হয়েছে। এটি প্রশংসনীয়, কিন্তু চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে এই প্রশংসা বেশি ক্ষণ ধরে রাখা যাবে না। দেখা যাক কি আছে ট্র্যাফিকিং ইন পার্সন (প্রিভেনশন, কেয়ার, রিহ্যাবিলিটেশন) ২০২১ বিলটিতে।

প্রথম কথা, বিলটির খসড়া তৈরি করে মতামত জানতে চাওয়ার আগেই যদি প্রতিটি রাজ্য সরকারের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যের সঙ্গে মত বিনিময় করে নেওয়া যেত, তা হলে এই আইনের রূপরেখা সার্বিক হতে পারত। কারণ পশ্চিমবঙ্গ পাচারকারীদের কাছে সোর্স, ডেস্টিনেশন ও ট্র্যানজিট এবং সর্বোপরি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় সঙ্গে রয়েছে আন্তর্জাতিক বর্ডার। পশ্চিমবঙ্গ সম্ভবত একমাত্র রাজ্য যেখানে নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ বিভাগের অধীনে একটি বিশেষ ডাইরেক্টরেট, ‘ডাইরেক্টরেট অফ চাইল্ড রাইটস আন্ড ট্র্যাফিকিং’ শিশু অধিকার এবং মানব পাচার রোধে কাজ করছে।

বিরুদ্ধ মত দমনের জন্যই কি ভিন্ন নামে ঘুরেফিরে সেই ঔপনিবেশিক আইন?
এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ইউনিসেফ-এর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে মানব পাচার রোধ, পুনর্বাসন, উদ্ধার, প্রতিরোধ সংক্রান্ত একটি রাজ্যস্তরীয় পরিকল্পনা ২০১৬-তে গ্রহণ করেছে। পশ্চিমবঙ্গে লালবাতি অঞ্চলের মেয়েদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে ‘মুক্তির আলো’ প্রকল্প, পুলিশের নেতৃত্বে ‘স্বয়ং সিদ্ধা’ প্রকল্প জনমানসে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কাজেই রাজ্য সরকারের অভিজ্ঞতা এই প্রস্তাবিত আইনটিতে যদি প্রতিফলিত হত তা হলে আইনটি নিঃসন্দেহে আরও সমৃদ্ধ হত। শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওডিশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরালা ইত্যাদি রাজ্যগুলি থেকে শিশু শ্রমিক হিসেবে পাচার এবং উদ্ধারের খবর নিয়ে বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া মুখরিত হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনটি সম্পর্কে প্রথম মতামতটি হল – আইনটির খসড়া প্রসঙ্গে মতামত চাওয়া অনেকটা মূর্তি রং করে ফেলার পর জানতে চাওয়া যে আরও কোন রঙের প্রলেপ দিলে ভালো হত। খসড়া আইনের কয়েকটি ধারাকে বিশ্লেষণ করা যাক। ধারা ৯(১) অনুযায়ী জেলাস্তরের অ্যান্টি-ট্রাফিকিং কমিটি পাচার প্রতিরোধ, সুরক্ষা, পুনর্বাসন ইত্যাদিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একটি জেলাস্তরের কমিটি কী করে এই দায়িত্ব পালন করবে তা বোধগম্য হল না, কারণ এগুলির জন্য বিভিন্ন রাজ্যে নারী, শিশু ও সমাজ কল্যান দপ্তর, সংবিধানের ৭৩ ও ৭৪ তম সংশোধনী অনুযায়ী গ্রাম এবং শহরের স্থানীয় প্রশাসন সহ অনেক সরকারি বিভাগ আছে। কী ভাবে এদের সঙ্গে সমন্বয় ঘটবে, খসড়ায় তা উল্লেখ করার দরকার ছিল। প্রতিরোধের কথা খসড়ায় থাকলেও এ সংক্রান্ত সার্বিক রূপরেখার অভাব রয়েছে।

প্রস্তাবিত বিলটিতে বেশ কিছু সমান্তরাল কমিটি এবং স্ট্রাকচার-এর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ইতিমধ্যে বিভিন্ন রাজ্যে অ্যান্টি-হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইউনিট, গ্রাম এবং ওয়ার্ড-ভিত্তিক চাইল্ড প্রোটেকশন কমিটি আছে কিংবা থাকার কথা, এগুলির সঙ্গে প্রস্তাবিত স্ট্রাকচার-এর সম্পর্ক কী হবে? জুভেনাইল জাস্টিস কেয়ার অ্যান্ড প্রোটেকশন অ্যাক্ট ২০১৫ অনু্যায়ী, চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি অর্থাৎ সিডব্লুসির ক্ষমতা প্রথম শ্রেণির বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের মতো অথচ এই আইনের ১৬(৯) ধারা অনুযায়ী কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সিডব্লুসি-কে জেলাস্তরের অ্যান্টি-ট্র্যাফিকিং কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে নিতে হবে। জুভেনাইল জাস্টিস সিস্টেমে বিচারবিভাগীয় ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সিডব্লুসি-র ক্ষমতা কিছুটা খর্ব করার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

প্রস্তাবিত বিলের ধারা ৫৫ অনু্যায়ী এই সংক্রান্ত আগের আইন বাতিল হওয়ার কথা নেই তবে প্রস্তাবিত আইনের সঙ্গে কোনও বিভ্রান্তি দেখা দিলে নতুন আইনটিই বলবৎ হবে। সুতরাং প্রস্তাবিত আইনটি সমান্তরাল আইন হিসেবে কি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে না? অপরাধ অনুসন্ধানে এনআইএ-কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কিন্তু বিভিন্ন রাজ্যের সিআইডি, শহর কমিশনারেটের গোয়েন্দা বিভাগ যথেষ্ট অভিজ্ঞ কাজেই এখানেও কিছু সমান্তরাল প্রক্রিয়া সমস্যা তৈরি করতে পারে।

সোমেন-পুত্র কি প্রণব-পুত্রের পথে?
প্রস্তাবিত আইনটি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে ১ মে, ২০১২ সালের অ্যাডভাইসরি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নীরব। এই অ্যাডভাইসরি অনু্যায়ী পাসপোর্ট-বিহীন, পাচার হয়ে আসা কোনও ভিনদেশি নারী ও শিশু অনুসন্ধানের পর যদি পাচারের ভুক্তভোগী হিসেবে প্রমাণিত হয়, তা হলে তাদের ফরেনার্স অ্যাক্ট অনু্যায়ী দোষী সাব্যস্ত না করে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। খসড়া আইনের ২২ ধারা অনু্যায়ী ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১৭-তে ‘ভিক্টিম কমপেনসেসন স্কিম’ বিজ্ঞাপিত করেছেন। এই নতুন আইনের পরিপ্রেক্ষিতে এই ধরনের স্কিমগুলির

কী হবে?

পশ্চিমবঙ্গের নারী শিশু উন্নয়ন এবং সমাজ কল্যাণ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী শশী পাঁজা এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন – ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার মানব পাচার রোধ, উদ্ধার এবং পুনর্বাসনে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে – আমাদের রাজ্যের রূপশ্রী, কন্যাশ্রী, মুক্তির আলো, মানব পাচার রোধ, প্রতিকার এবং প্রতিরোধ সংক্রান্ত রাজ্য পরিকল্পনা ২০১৬, সব মিলিয়ে একটা প্যাকেজ। আমাদের ভিক্টিম কমপেনসেশন স্কিম যথেষ্ট মানবদরদি’।

শিশুসুরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং জয়প্রকাশ ইনস্টিটিউটের ডাইরেক্টর জয়দেব মজুমদারের মতে, ‘তড়িঘড়ি করে এ রকম একটি আইন তৈরি না করে সংশ্লিষ্ট সিভিল সোসাইটি সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করলে ভালো হত, আইনটির কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও অন্যান্য আইনের সঙ্গে অসঙ্গতি খুব স্পষ্ট’।

মমতার পালটা শুভেন্দু, বিচার ব্যবস্থায় দল খুঁজছেন উভয়েই
ইতিপূর্বে ২০১৮ সালে অনুরূপ আইন লোকসভায় পাশ হলেও রাজ্যসভায় উত্থাপিত না হওয়ায় বিলটি হিমঘরে চলে যায়। এই ধরনের মানবাধিকার, শিশু ও নারী অধিকার সংক্রান্ত আইন রূপায়ণে কী করে অর্থ সংস্থান হবে তার রূপরেখা আইনটিতেই উল্লেখ করা উচিত ছিল। আবার মনে করিয়ে দিতে চাই চলতি বছরে কেন্দ্রীয় সরকারের শিশুখাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের ২.৪৬ শতাংশ, যা বিগত দশ বছরের মধ্যে সব থেকে কম। এই আইনটি শুধু শিশু পাচার রোধের আইন নয়, সার্বিক ভাবে মানব পাচার রোধের আইন। তাই তাড়াহুড়ো না করে আরও বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকারের মতামত নেওয়ার পরেই বিলটি পার্লামেন্টে উত্থাপিত হওয়ার আর্জি রইল।

(এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণ ভাবে লেখকের ব্যক্তিগত। এই সময় ডিজিটাল কোনও ভাবেই তার দায়ভার বহন করে না।)


Source link

x

Check Also

জেলে স্বামী, হাতজোড় করে কী আর্জি জানালেন শিল্পা?

এই সময় ডিজিটাল ডেস্ক: ১৪ বছর পর ফের বড় পর্দায় ফিরছেন শিল্পা শেট্টি। কিন্তু ভাগ্যের ...